হালনাগাদ প্রতিবেদক: বর্ষাকাল বলতেই আমরা ধরে নিই কাদা, পানি, স্যাঁতস্যাঁতে অবস্থা। এর মধ্যে আবার বেড়ানো যায়? বড় জোড় ছাদে গিয়ে বৃষ্টিতে ভেজা এই পর্যন্ত ঠিক আছে। কিন্তু দূরে কোথাও ভ্রমণের কথা কখনওই আমাদের মাথায় আসে না। অথচ আপনি জানেন কি, বাংলাদেশে এমন কিছু জায়গা রয়েছে যেখানে প্রকৃতি তার রূপ খোলে বর্ষাতেই? গ্রীষ্ম বা শীতে শুকিয়ে কাঠ, কিন্তু বর্ষা এলেই প্রাণ ফিরে পায় জায়গাগুলো।
বাংলাদেশ ষড়ঋতুর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অপার লীলাভুমি। একেকটি ঋতুতে এ দেশের প্রকৃতি সাজে ভিন্ন ভিন্ন রূপে যা ভ্রমণপিপাসুদের অতৃপ্ত মনকে তৃপ্তি দিয়ে থাকে। সব ঋতুতে যদিও প্রকৃতির বহুরূপী সৌন্দর্য উপভোগ করা যায়। তবুও নির্দিষ্ট ঋতুতে কিছু কিছু স্থান যেন তার যৌবন ফিরে পায়। অর্থাৎ সেই নির্দিষ্ট সময়ে আপনি ওই স্থানের রূপ-সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারবেন অন্য সময়ের চেয়ে একটু বেশিই। আসুন জেনে নেওয়া যাক কোথায় ঘুরতে যাওয়া য
বিছনাকান্দি: বর্তমানে সিলেটের সবচেয়ে জনপ্রিয় ভ্রমণ গন্তব্য। এ জায়গাতেও ভ্রমণের আসল সময় বর্ষাকাল। জেলার গোয়াইনঘাট উপজেলার রুস্তমপুর ইউনিয়নের সীমান্ত ঘেঁষে এই জায়গা। পাথর বিছানো বিস্তীর্ণ প্রান্তরের উপরে বয়ে চলা মেঘালয়ের পাহাড়ি ঝরনাধারা বিছনাকান্দির মূল আকর্ষণ। যেতে হয় পাহাড়ি নদী পিয়াইন ধরে। এ নদী যৌবন পায় কেবল বর্ষায়। তখন ভরা পিয়াইনের বুকে চলতে চলতে এর দুই পাশের দৃশ্য দেখে বিমোহিত হবেন যে কেউ। পিয়াইনের পরে আকাশে হেলানো উঁচু উঁচু পাহাড়ের সারির পায়ের কাছেই পাথর বহর।
রাতারগুল: বাংলাদেশের একমাত্র মিঠা পানির জলাবন রাতারগুল। সিলেট জেলার গোয়াইনঘাট উপজেলায় অবস্থিত এ বন বছরের প্রায় অর্ধেকেরও বেশি সময়ই ডুবে থাকে। সিলেট বন বিভাগের উত্তর সিলেট রেঞ্জে-২ এর অধীন প্রায় ৩ হাজার ৩২১ একর জায়গা জুড়ে রাতারগুল জলাবনের অবস্থান। এর মধ্যে ৫০৪ একর জায়গায় মূল বন, বাকি জায়গা জলাশয় আর সামান্য কিছু উঁচু জায়গা।
শুধু বর্ষা ও বর্ষা পরবর্তী সময়ে পুরো জঙ্গলই পানিতে ডুবে থাকে। শীতে প্রায় শুকিয়ে যায় রাতারগুল। তখন কেবল জল থাকে বনের ভেতরে খণন করা বড় জলাশয়গুলোতে। রাতারগুলের সৌন্দর্য দেখতে হলে তাই যেতে হবে।
হাম হাম ঝর্ণা: জলপতনের যে শব্দ স্হানীয় ভাষায় তার উচ্চারন - হাম হাম। ৭ হাজার ৯শ ৭০ একর আয়তনের রাজকান্দি সংরক্ষিত বনাঞ্চল -শ্রীমঙ্গলের কুরমা বন বিটের পাহাড়ের পশ্চিম প্রান্তে অবস্থিত ন্যাশনাল টি কোম্পানির চাম্পারায় চা বাগান আর পূর্ব-দক্ষিণে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের সীমান্তাঞ্চল। শ্রীমঙ্গল শহর থেকে প্রায় ৬০ কিলোমিটার পূর্ব দিকে দুর্গম পথের শেষে বনের মাঝে অবস্থিত এ জলপ্রপাতটি। বর্ষায় প্রচন্ড জলের ধারা মুগ্ধ করবে আপনাকে। অন্য ঋতুতে গেলেও হাম হাম দেখতে পাবেন। কিন্তু বর্ষার তুলনায় তা কি
সাজেক ভ্যালি: বর্ষায় ভ্রমণের আরেকটি অসাধারণ জায়গা সাজেক ভ্যালি। রাঙামাটি জেলার বাঘাইছড়ি উপজেলার দুর্গম পাহাড়ের চূড়ায় এর অবস্থান। তবে যাওয়ার সহজ পথ খাগড়াছড়ি থেকে। এখানে পর্যটকদের থাকার জন্য সেনাবাহিনীর উদ্যোগে গড়ে তোলা হয়েছে সাজেক রিসোর্ট। সাজেক ভ্যালির উপর থেকে চারপাশের সৌন্দর্য খুবই মনোরম। সাজেক ভ্যালির আরও উপরে আছে আদিবাসীদের একটি গ্রাম।
শ্রীমঙ্গল: বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি চা বাগান মৌলভীবাজার জেলায়। আর এ জেলার সবচেয়ে বেশি চা বাগান শ্রীমঙ্গলে। চা বাগানে ভ্রমণের উপযুক্ত সময় বর্ষাকাল। একমাত্র বর্ষাকালেই চা বাগানগুলোতে কর্ম চাঞ্চল্য থাকে। বাগানগুলোও থাকে বেশি সজীব। শ্রীমঙ্গলের চা বাগান ভ্রমণের সঙ্গে অবশ্যই উপভোগ্য হবে বর্ষার লাউয়াছড়া উদ্যান। বর্ষায় এ উদ্যানে ভ্রমণে বেশ উপভ
জাফলং: পাহাড়, টলটলে স্বচ্ছ পানির ধারা আর পাথরের মিতালী জাফলং। ডাউকি ব্রীজ। দুই পাহাড়ের মাঝে সংযোগ তৈরি করতে বানানো হয়েছে ব্রীজটি। জাফলং এর ঘন সবুজ বনাঞ্চল মুগ্ধ করবে আপনাকে। পাশেই আছে খাসিয়ে পল্লী, ঘুরে আসতে পারেন সেখান থেকেও।
নেত্রকোনার হাউরঃ নেত্রকোনা জেলার মোহনগঞ্জ, মদন, খালিয়াজুড়ি ও কলমাকান্দা উপজেলা জুড়ে কমবেশি ৫৬টি হাওর ও বিল আছে। শুকনা মৌসুমে হাওরে চাষাবাদ হলেও বর্ষায় পানিতে পরিপূর্ণ থাকে এসব হাওর-বিল। তখন এসব এলাকার একমাত্র বাহন হয় নৌকা। বর্ষাকালে হাওরের গ্রামগুলি একেকটি ছোট দ্বীপের মতো মনে হয়।
নীলাচল: বান্দরবান শহরের সবচেয়ে কাছে সবচেয়ে সুন্দর পর্যটন কেন্দ্র। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১ হাজার ৬শ’ ফুট উঁচু এ পর্যটন কেন্দ্র। বর্ষায় এ জায়গা থেকে মেঘ ছোঁয়া যায়। বান্দরবান জেলা পরিষদের উদ্যোগে গড়ে তোলা মনোরম এ পর্যটন কেন্দ্রে পর্যটকদের থাকার জন্য রিসোর্টও আছে। বান্দরবান শহর থেকে প্রায় ছয় কিলোমিটার দূরে টাইগারপাড়া এলাকায় পাহাড়ের গায়ে গায়ে লাগোয়া জায়গায় পর্যটকদের জন্য আছে নানা ধরণের ব্যবস্থা। শহর ছেড়ে চট্টগ্রামের পথে প্রায় তিন কিলোমিটার চলার পরেই হাতের বাঁ দিকে ছোট একটি সড়ক এঁকেবেঁকে চলে গেছে নীলাচলে। এ পথে প্রায় তিন কিলোমিটার পাহাড় বেয়ে তাই পৌঁছুতে হয়। মাঝে পথের দুই পাশে ছোট একটি পাড়ায় দেখা যাবে ক্ষুদ্র নৃ গোষ্ঠ বান্দরবান শহর থেকে প্রায় ৫২ কিলোমিটার দূরে সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ২ হাজর ২শ’ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত একটি মনোরম পর্যটন কেন্দ্র নীলগিরি। সেনাবাহিনী পরিচালিত এ পর্যটন কেন্দ্রে থাকার জন্য ভালো মানের কটেজ আছে। নীলগিরি পর্যটন কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে যেদিকে চোখ যায় শুধু পাহাড় আর পাহাড়। এখানে পর্যটকদের সঙ্গে মেঘের মিতালিও হয়। এখানে ভ্রমণের উপযুক্ত সময়।
ট্রেকিংয়ের সমময় মেনে চলুন ৬ টিপস
হালনাগাদ প্রতিবেদক: পাহাড়ি পথে ট্রেকিং এখন তারুণ্যের ট্রেন্ড হয়ে দাঁড়িয়েছে। নির্জন পাহাড়ি এলাকায় নিজেদের মতো করে সময় কাটাতে পরিবার, বন্ধু কিংবা বিভিন্ন দলের সঙ্গে বেরিয়ে পড়াটা এখন বেশ স্বাভাবিক বিষয়। সাহসের ওপর ভর করে মস্ত পাহাড়ের পথে কিংবা অপ্রচলিত পথে কোনো ঝরনা দেখতে বেরিয়ে পড়াই যায়। তবে কোনো রকম প্রস্তুতি বা পূর্ব ধারণা ছাড়া ট্রেকিং ঝুঁকিপূর্ণ আর কঠিন বিষয়। কথায় বলে, দুঃসাহসে দুঃখ হয়। আর প্রকৃতির সামনে দুঃসাহস না দেখানোই ভালো।
সংখ্যা গুনে টিপস দেওয়া সম্ভব নয় ট্রেকিংয়ের জন্য। এটি অভিজ্ঞতার ওপর নির্ভর করে। তবে প্রাথমিকভাবে কী করবেন, সে বিষয়ে কিছু কথা বলা যায়। এগুলো অপরিচিত পাহাড়ি অঞ্চলে রোমাঞ্চকর মুহূর্ত উপভোগ করতে আপনাকে সহায়তা করবে। আপনার প্রস্তুতি ও পথের ধারণা যত ভালো থাকে।
ট্রেকিং টিপস
১. খুব সহজ ও কার্যকর টিপস হলো দেশেই ট্রেকিং শুরু করা। আমাদের পার্বত্য এলাকায় বিভিন্ন ধরনের ট্রেকিং ট্রিপ হয়ে থাকে। ৮ থেকে ১০ দিনের এক্সট্রিম ট্রেকিং থেকে অল্প কষ্টের যে-ট্রিপ। কোথায় যাবেন তার ওপরে ভিত্তি করে দিনের হিজাব হয়। শুরু করুন যে-ট্রিপ থেকে। কোনো সহজ পথের ঝরনা দেখা, ক্যাম্পিং এবং ছোট মেইলে ট্রিপ করুন। তারপর কিছুটা অভ্যস্ত হলে পাহাড় সার্কিট করুন।
২. ট্রেকিংয়ের জন্য শারীরিক সামর্থ্য জরুরি। প্রচুর হাঁটার অভ্যাস করতে হবে। নইলে হঠাৎ করে লম্বা ট্রেইলে গেলে খুব অল্পেই হাঁপিয়ে উঠবেন। এর পাশাপাশি শ্বাস-প্রশ্বাসসহ বিভিন্ন সমস্যার মুখোমুখিও হতে হবে। তাই শুরুতে কমপক্ষে ৩০ মিনিট একটানা হাঁটার অভ্যাস করুন। ধীরে ধীরে সময় বৃদ্ধি করে ঘণ্টায় নিয়ে যান। এই অভ্যাস থাকলে ট্রেইলে চাঙা থাকবেন। এই অভ্যাসের জন্য কর্মস্থল ও বাসায় লিফট বাদ দিয়ে সিঁড়ি ব্যবহার করুন। এ ছাড়া শারীরিক সক্ষমতা বাড়াতে সাইকেল চালাতে কিংবা সাঁতার কাটতে পারেন। সম্ভব হলে জিমে যেতে পারেন। এতে পায়ের পেশি শক্তিশালী হবে এবং পেশি শক্তিশালী করা বিরূপ পরিবেশে শারীরিক সহ
পাহাড় থেকে নামতে হবে সতর্ক হয়ে
৩. ব্যাগে কী নেবেন, ট্রেকিংয়ে সেটি খুব গুরুত্বপূর্ণ। ব্যাগ গোছানোর ক্ষেত্রে সব সময় হালকা জিনিস নিচে এবং ভারী জিনিস ওপরে রাখবেন। আলাদা কম্পার্টমেন্টযুক্ত ভালো প্যাডিং সিস্টেমের ব্যাগ ব্যবহার করতে হবে। খেয়াল রাখতে হবে কাঁধের ওপর দুই বেল্ট যাতে মোটা ও ফোমযুক্ত হয়। দুই কাঁধের ভার সমান রাখতে হবে। কাঁধের ওপর যাতে অতিরিক্ত চাপ না আসে এবং ব্যাগ যেন পিঠের সঙ্গে লেগে থাকে, সে বিষয়ে খেয়াল রাখতে হবে। ব্যাগের ওজন বহনক্ষমতার বেশি হওয়া যাবে না।
৪. ব্যাগে কিছু শুকনো খাবারের পাশাপাশি পানির বোতল, প্রয়োজনীয় ওষুধপত্র এবং পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট সঙ্গে রাখতে হবে। মশা ও পোকামাকরের হাত থেকে বাঁচতে মসকিউটো রিপেলেন্ট নিতে ভোলা যাবে না।
৫. নিজের গতিতে হাঁটতে থাকবেন। ট্রেইলে সবার আগে থাকা কিংবা সবার পেছনে থাকা বিষয়ে কোনো নেতিবাচক ধারণা পোষণ করা যাবে না। ট্রেইলে নিজের গতি উপভোগ করতে করতে এগিয়ে যেতে হবে। শক্তি কমে আসার আগেই একটু দাঁড়ান, লম্বা লম্বা শ্বাস নিন এবং আশপাশের প্রকৃতি দেখে মুহূর্তগুলো উপভোগ করার চেষ্টা করুন। এতে কষ্ট কম হবে।
৬. পাহাড়ে ওঠা ও নামার সময় খেয়াল রাখতে হবে যাতে পায়ের গোড়ালি আগে মাটি স্পর্শ করে, তারপর পায়ের পাতা। মাথা ও পিঠ সোজা রাখতে হবে। তাতে মেরুদন্ডপ্রাতিষ্ঠানিকভাবে ট্রেকিং-সম্পর্কিত ট্রেনিং দেওয়া আমাদের দেশে এখনো পুরোপুরি শুরু হয়নি। তবে বিভিন্ন ট্রাভেল গ্রুপ ট্রেকিং ট্যুরের আয়োজন করে। তারা অংশগ্রহণকারী সদস্যদের ট্রেকিং বিষয়ে অল্পবিস্তর ধারণা দিয়ে থাকে। এ জন্য মাঝে মাঝে কর্মশালারও আয়োজন করে প্রতিষ্ঠানগুলো। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রোপ ফোর, জোছনা তরী, হিট দা ট্রেইল ও বেঙ্গল ট্রেকার্স অন্যতম। দেশে কিছুদিন ট্রেক করে তবেই ভারত বা নেপালের বিভিন্ন ট্রেকিং ট্রিপে যোগ দিন।ের ওপর চাপ কম পড়বে।

